
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা ও নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় মক্কা প্রতিরক্ষা জোট সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সোমবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জোটের কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে জোটের অংশীদার পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবে দ্রুত সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবারের বৈঠকের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, জোটের নির্বাহী কমিটি যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অবিলম্বে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য সৌদি আরবে দ্রুত মোতায়েনের লক্ষ্যে সম্মত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত আগস্টে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের চুক্তিতে নির্ধারিত শর্ত মেনেই পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের অনুমোদিত ব্যবস্থা এবং নিজ নিজ দেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী এই মোতায়েন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করা, তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মুসলিমদের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা এবং সৌদি শহরগুলোর পাশাপাশি বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হুথিদের ধারাবাহিক হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছে পাকিস্তান ও তুরস্ক।
রিয়াদের বৈঠকে তিন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সোমবারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা, কূটনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন।
তুরস্কের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারোগলু।
পাকিস্তানের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার, চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ।
সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ফায়াদ বিন হামেদ আল রুওয়াইলি।
বৈঠকে আরও অংশ নেন পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুমান মাহমুদ। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মহাসচিব হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম মহাসচিব পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল
জোটের কমিটি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুমান মাহমুদকে তিন বছরের মেয়াদে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
জোটের তিন সদস্যদেশ বলেছে, একটি সদস্যদেশের নিরাপত্তা অন্য দুই দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যৌথ প্রতিরক্ষার জন্য মক্কা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তুলে ধরেছে দেশগুলো। তাদের মতে, এর ফলে জোটের প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
হুথি হামলায় বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা
হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যেই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত এলো। হুথিরা দাবি করেছে, সৌদি আরবে তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো।
ইরানের মদতপুষ্ট হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেন থেকে দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোতে হামলা এবং নিরাপত্তা হুমকি বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিন দেশ জোট সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ চলছিল। আগস্টে ইস্তাম্বুলে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানেরা বৈঠক করেন। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর রিয়াদে তিন দেশের সামরিক প্রধানেরা আরও আলোচনা করেন।
সোমবার রিয়াদের বৈঠকের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে গিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা জোট সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।



